ভাষা-বাসী : দ্বিতীয় পর্ব

Spread the love

ক্লাসে স্যার না এলে বা দেরি করে এলে, আমরা সকলে সেই বন্ধুর চারপাশ ঘিরে বসতাম যে ভালো গল্প বলে, বানিয়ে হলেও বলে ভালো। একদম ছোটবেলায় লোডশেডিং-এর সন্ধ্যায় ঠাকুমার কাছে হ্যারিকেন জ্বেলে, হাতপাখার হাওয়া খেতে খেতে ভূতের গল্প শোনা, বা বড় হয়ে রেডিওতে গল্প শোনার মোহ কি আমাদের জাপটে ধরেনি বারবার? তা আগের দিন যা বলছিলাম, কথা বলা শুরুর পর্বে আমাদের পূর্বপুরুষরা অদ্ভুত কিছু শব্দ বের করতেন গলা দিয়ে, ধীরে ধীরে কল্পনার মিশেল তাকে বাক্যের অনুভূতি দিল। সেই থেকেই অপরিশোধিত ভাষার উদ্ভব। মানুষ যে উন্নত জীব হয়ে উঠল তার কারণ তাঁরা দল গড়তে সক্ষম, স্বচ্ছন্দ আর তাঁর পরচর্চা করার প্রবণতা হলেও শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট অর্জনের চাবিকাঠি হয়ে উঠলো মানুষের কল্পনাপ্রবণ মগজ। কারণ বুদ্ধিমত্তার দিক থেকে বেশ কিছু প্রাণী (যেমন, অক্টপাস) মানুষের থেকে এগিয়ে, আবার গোষ্ঠী গঠনে টেক্কা দেওয়ার প্রাণীও (যেমন, মৌমাছি বা পেঙ্গুইন) আছে অনেক। এই অপরিনত, অপরিশীলিত ভাষা তাঁরা দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার করা শুরু করল তাঁদের প্রতিমুহূর্তের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া এবং ভাবনা একে অন্যের সাথে বিনিময় করার মাধ্যম হিসেবে। পশু শিকারের কাহিনীসহ প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকার বীরগাঁথা, এসবই ছিল তাঁদের গল্প বলার বিষয়। গল্প বলার মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বংশ সম্বন্ধীয় তথ্য ও সম্পদসূত্র সঞ্চারিত করাই ছিল প্রথম দিকে গল্প কথকদের উদ্দেশ্য। ভৌগলিক অবস্থানের কারণে দূরে দূরে বাসস্থান হওয়ায়, এই সব তথ্য নিজের গোষ্ঠী বা পরিবারের বাইরে প্রয়োগ করা অথবা ব্যবহার করা অসম্ভব ছিল। দিন এগোল, মানুষের কল্পনার জমি বাড়ল, আরও সূক্ষ্ম ভাবনায় মানুষের গল্প বলার ধরণ শাণিত হতে লাগল। যেহেতু কাগজ আবিষ্কার অনেক দূরের যাত্রা, তাই শুনে শুনে মনে রাখাটাই বংশপরম্পরায় তথ্য সঞ্চারিত করার এক মাত্র পথ। গল্পকাররা বিভিন্ন লোককথা, ধর্মকথা এমন ভঙ্গিতে স্বরক্ষেপণের সঙ্গে নাটকীয়তার মিশেলে উপস্থাপন করতেন যে তা অচিরেই মানুষের মনে দাগ কাটত, চেতনায় বা অবচেতনায় আজীবন থেকে যেত সেই গল্পকে অবলম্বন করে গাঁথা তথ্যের মালা। আস্তে আস্তে সম্পূর্ণ কল্পকাহিনীও জায়গা করে নিল কথকদের কন্ঠে, তাঁরা অনুভব করলেন যে শ্রোতাদের প্রভাবিত করতে পারছেন তাঁরা, ভালো এবং খারাপ—যেমন চাইছেন, ঠিক তেমন ভাবেই। সেই সমীকরণেই গল্পকারের অঙ্গুলীহেলনের মাধ্যমে মানুষের চালিত হওয়া শুরু হল, কথকের নির্ধারিত পথে। এই পথ অবলম্বন করে গল্পকাররা সমাজের শীর্ষভাগ দখলের কাজে নিমগ্ন হলেন। এর থেকে বলাই যায় যে গল্পকথন একটি সাংঘাতিক দক্ষতার বিষয় এবং গল্পকথনের মধ্যে দিয়ে শ্রোতাকে সম্মোহন করা একটি শিল্প। ভেবে দেখুন, বিশ্বরাজনীতির কান্ডারীদের অন্য কোথাও মিল থাকুক বা না থাকুক, গল্পের ফেরিওয়ালা হিসাবে মিল শতাংশে! যাই হোক! আদিম যোগাযোগ ব্যবস্থার অবিস্মরণীয় মাধ্যম যে গল্প বলা, তা অস্বীকারের জায়গা নেই আজ। যদি এটি না থাকত, তবে কোনকিছুই আমাদের জঙ্গলের বাইরের আধুনিক জীবনে প্রবেশ করাতে পারত না।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : বিজয় দাস।

চিত্রঋণ : AnimatorIsland

 

Share Your Perception

Back to top